রাখাল থেকে যখন গভর্নর

414
নতুন নতুন চাকরির পোষ্ট পেতে আমাদের পেজ লাইক ও শেয়ার করে রাখুন

ব্রাহ্মণ চন্ডাল চামার মুচি,
এক জলেই সব হয়গো শুচি,
দেখেশুনে হয়না রুচি।

লালনের গান। সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। আরবি ভাষায় যাকে আশরাফুল মাকলুকাত বলে আমরা জানি। আসলেই কি তাই নয়? কি পারে না এই মানুষ? ত্যাগ তিতিক্ষা আর শ্রম দিয়ে পাহাড়ের বড় বড় উচ্চতাকেও টলায়। উপরে লালন ফকিরের লাইনটি আমি এই জন্যেই উচ্চারণ করলাম যে জাতের সঙ্গে আমাদের সমাজের কিছু অংশ ক্লাসকেও বড্ড বেশি ধিক্কার জানায়। কিন্তু এদের অধিকাংশই জানে না আজ যার চাল আনতে নুন ফুরায় এই তারই একদিন গাড়ি, বাড়ি, সহায় সম্পত্তি সব হবে কিংবা হয়। নজির খুঁজতে বেশিদূর কেন? এই বাংলার সন্তান গর্ভনর আতিউর রহমানকে নিশ্চয়ই সবাই চিনেন? কিন্তু আপনি জানেন কি কত সংগ্রামের, কত উপোষ পেটের হাহাকারে বড় হয়ে তিনি আজকের আতিউর? জানতে হলে পড়তে হবে আমাদের আজকের আয়োজন। তবে চলুন জেনে নেয়া যাক এই বিখ্যাত সূর্যসন্তানের জীবনী:

ছবিসূত্র:e-news-press

আতিউর রহমান জামালপুর জেলার এক অজপাড়াগাঁয়ে জন্মগ্রহণ করেন। চৌদ্দ থেকে পনেরো কিলোমিটারের দূরের শহরে যেতে হতো আতিউরের পায়ে হেঁটে বা সাইকেলে চড়ে। তার বাবা একজন অতি দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক। পাঁচ ভাই, তিন বোনের কোনো রকম খেয়ে না খেয়ে দিন কাটতো। আতিউরের বড় ভাইয়ের আর্থিক অবস্থা ছিলো মোটামুটি ভালোই। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, বাবাকে বাড়িতে ঠাঁই দেননি তার বড় ভাই। একটি ছনের ঘরে ভাই-বোন আর বাবা-মা নিয়ে থাকতো আতিউর। মামার বাড়িসূত্রে তার মা তিন বিঘা জমি কিনেন। অনুর্বর জমিতে বহু কষ্টে তার বাবা যা ফলাতেন বছরে সাত-আট মাসের খাবার কোনোমতে জুটতো।

আতিউর যখন তৃতীয় শ্রেণীতে, তখন পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর হয়নি। লেখাপড়া ছেড়ে উপার্জনের পথে নামতে হয় তাকে। আতিউরদের একটি গাভী আর কয়েকটি ছাগল ছিল। সকাল থেকে সন্ধ্যা অবধি মাঠে এগুলোকেই দেখাশুনা করতেন আতিউর । বিকেল বেলা দুধ বাজারে বিক্রি করে যা জুটতো তাতে কোনোমতে চলতো আতিউরদের সাধারণ জীবন। কিছুদিন পর দুধ বিক্রির উপার্জন থেকে জমানো আট টাকা দিয়ে পান-বিড়ির দোকান দেয় আতিউর । সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দোকানের জীবন শুরু করে আতিউর।

একদিন আতিউরের বড় ভাই তাকে স্কুলে নাটক দেখতে নিয়ে যান। পরনে নেই ভালো কাপড়। ছেঁড়া লুঙ্গি পরেই দে ছুট। স্কুলে এসে জনতাম ভীড় আর ছেলে-মেয়েদের দেখে তার আবার স্কুলে আসতে মন চায়। একথা তার বড় ভাইকে জানালে বড়ভাই পরদিনই হেডমাস্টারের কাছে নিয়ে যান।
ভাইয়ের মুখে পড়ার কথা শুনে হেডস্যার অবজ্ঞা করেই বললেন সবাই আবার পড়তে পারে নাকি?

বিদায়ি ভাষণ; ছবিসূত্র:বিডি নিউজ ২৪ ডট কম

তবু বড় ভাইয়ের অনেক অনুরোধের পর পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি দেন স্যার। পরীক্ষার তখন বেশি দেরি নেই, মাত্র তিন মাস বাকি। বাড়ি ফিরেই আতিউর মাকে বলেন, তিন মাসের ছুটি চাই মা। খাবার নেই, কাপড় নেই, বইও নেই, কিন্তু লক্ষ্য একটাই পরীক্ষায় পাস করতেই হবে। বন্ধু মুজ্জামেলের বাসায় গিয়ে বই ভাগাভাগি করে পড়ে পূর্ণ প্রস্তুতি সম্পন্ন করেন। পরীক্ষা শুরু হলো। এক-একটি পরীক্ষা শেষ হচ্ছে ক্রমেই উজ্জীবিত হচ্ছে আতিউর । ফল প্রকাশের দিন হেডস্যার শুরুর দিকেই আড়চোখে দেখছিলেন আতিউরকে, তারপর ফল ঘোষণা করলেন। ক্ষুধার্ত আতিউর ক্লাসে প্রথম!

আতিউর রহমান,ছবিসূত্র:আমাজন নিউজ ডট কম

তারপর স্লোগানের পর স্লোগান দিয়ে গ্রামের লোকজন আতিউরকে বাড়ির পাশে রেখে যায়। মূর্খ বাবা এইটুক বুঝলেন ছেলে বিশেষ কিছু করেছে, এর বেশি আর কি চাই তার? পরদিনই তাদের খাসি বাজারে বারো টাকায় বিক্রি করে নতুন বই কিনে আনেন তার বাবা। প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে জুনিয়র হাইস্কুলে (বর্তমান দিগপাইত ডি.কে উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হয় আতিউর।

আতিউর যখন সপ্তম শ্রেণী পেরিয়ে অষ্টম শ্রেণীতে, তখন তার চাচা তাকে এক বিজ্ঞাপন দেখায় । যা মূলত ক্যাডেট কলেজে ভর্তির বিজ্ঞাপন। ফর্ম জমা দেবার সময় তার নাম ছিল আতাউর রহমান। কিন্তু ক্যাডেট কলেজের ভর্তি ফরমে স্কুলের প্রধান শিক্ষক আতিউর রহমান লিখে তার চাচাকে বলেছিলেন, এই ছেলে একদিন অনেক অনেক অনেক বড় কিছু হবে। দেশে হাজারো আতাউর আছে। ওর নামটা একটু বিশেষ হওয়া দরকার। পরে তার নাম হয় আতিউর। পরীক্ষা হয়, ফলাফল প্রকাশিত হয়। আতিউর মনোনীত হন। কিন্তু তার মন খারাপ পরবর্তী পরীক্ষায় যাবার জন্য তার কোনো প্যান্ট নেই! পরে তারই
স্কুলের কেরানি কানাই লাল বিশ্বাসের ফুলপ্যান্টটা ধার করে তারপর আতিউর পরীক্ষা দেয়। কিন্তু সে ধরে নেয় তার বোধদয় চান্সটা হবেই না। বাড়ি ফিরে আবারো পড়ালেখা শুরু।

তিন মাস পর চিঠি আসে, তিনি মনোনীত চূড়ান্তভাবে! চিঠিতে উল্লেখ করা, প্রতি মাসে বেতন ১৫০ টাকা। যার ১০০ টাকা তিনি বৃত্তি পাবেন। বাকি পঞ্চাশের কথা শুনে আতিউর রীতিমতো থতমত খান। যেখানে খাবার জুটানোই কষ্টকর, সেখানে পঞ্চাশ টাকা?

গ্রামের মৌলভী স্যারের সহযোগীতায় গ্রামেরই অলিগলি ঘুরে, সবাই সাধ্য মতো আট আনা, চার আনা, এক টাকা, দুই টাকা দেয়। সব মিলিয়ে এক পর্যায়ে দেড়শত টাকা হয়। আর আতিউরের চাচারা দেয় আরও পঞ্চাশ টাকা। এই সামান্য টাকা সম্বল করে আতিউর মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজে ভর্তি হন । তিন মাসের বেতন পরিশোধ করে শুরু করে অন্য এক জীবন। প্রথম দিনের ক্লাশেই সব খুলে বলেন আতিউর, স্যারেরা মিটিং করে সিদ্ধান্ত নেয় দেড়শত টাকাই বৃত্তি দেয়া হবে। পরে আর ফিরে তাকাতে হয়নি আতিউরের। এস এস সি পরীক্ষায় ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম স্থান অধিকার করার পর তার সফলতার মুকুট তো রীতিমতো আকাশছোঁয়া! সব সফলতায় আতিউর ব্যাংক গর্ভনর!

অনেকেই রীতিমতো কান্না করছেন, কি ছিলো এই আতিউরের, আর আজ কি নেই? একবার ভাবুন তো! দারিদ্রতা কোনো মানুষের পথের কাঁটা হতে পারে না, যদি সে চেষ্টা চালায় সর্ব্বোচ্চ। এমন হাজারো আতিউর জন্ম নিক এই বাংলায়, হাজারো প্রতিভাবান আসুক মায়েদের কোল জুড়ে।